ঢাকা ০২ অক্টোবর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
নজরুল বহাল, মিষ্টির পদত্যাগ: যা বললেন অ্যাটর্নি জেনারেল সেপ্টেম্বরে এলো ৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রবাসী আয় ক্যান্টনমেন্টে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া আহত যুবকের মৃত্যু মেট্রোরেলের দুই লাইনে ৪৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন মিষ্টির পদত্যাগপত্র পেয়েছি, আজ থেকেই কার্যকর : স্পিকার ৪৯তম বিসিএসে বাদ পড়া ৪৬ জনের গেজেট সোমবার ৬ মাস নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রোনালদো সোনা জিততে চাওয়া বাংলাদেশ ব্রোঞ্জ পাবে তো? শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণীজনদের মূল্যায়নের আহ্বান রাষ্ট্রপতির বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে আইন সবার জন্য সমান

হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় তরুণ কান্তি বালাকে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কেন

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ জুলাই, ২০২৬,  12:09 AM

news image

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (এমএম) (পূর্ব) তরুণ কান্তি বালাকে নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদে যেভাবে তাকে দুর্নীতিবাজ, অবৈধভাবে চাকরিতে বহাল, ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা কেবল সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা লঙ্ঘনই নয়—বরং বিচারাধীন বিষয় নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার সুস্পষ্ট অপচেষ্টা।

সংবাদটিতে একাধিক অভিযোগ এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, যেন সেগুলো ইতোমধ্যে আদালত বা রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থা দ্বারা প্রমাণিত সত্য। অথচ বাস্তবতা হলো—উল্লেখিত অধিকাংশ বিষয়ই বিচারাধীন, তদন্তাধীন অথবা অভিযোগকারীদের দাবি মাত্র। একটি গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো অভিযোগ ও প্রমাণিত সত্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা। কিন্তু আলোচ্য প্রতিবেদনে সেই মৌলিক নীতিই উপেক্ষা করা হয়েছে।

হাইকোর্টে বড় আইনি বিজয়: ১৭ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহালঃ
সংবাদটিতে সবচেয়ে গুরুতর গোপনীয়তা হলো—তরুণ কান্তি বালার মুক্তিযোদ্ধা গেজেট বাতিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তার অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিজয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ, মাননীয় বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং মাননীয়া বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রিট পিটিশন নং ২০৪৫২/২০২৫-এ ১৭ মে ২০২৬ তারিখে আদেশ দিয়ে পূর্বে জারি করা স্টে অর্ডার আরও ছয় (৬) মাসের জন্য বর্ধিত করেন। ফলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এর সুপারিশে জারি করা গেজেট বাতিলের কার্যকারিতা ১৭ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, যদি এর মধ্যে আদালত নতুন কোনো আদেশ না দেন।

অর্থাৎ, আদালতের বর্তমান আদেশ অনুযায়ী তরুণ কান্তি বালার বীর মুক্তিযোদ্ধা মর্যাদা, ভাতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত সুবিধা বহাল রয়েছে। এই বাস্তবতা গোপন রেখে তাকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে সন্দেহের চোখে উপস্থাপন করা কেবল বিভ্রান্তিকর নয়, বরং আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের তাৎপর্যকে খাটো করার শামিল।

আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে সংবাদ পরিবেশনঃ
হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে গেজেট বাতিলের কার্যকারিতা স্থগিত রেখেছেন। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে তার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিকে অবৈধ বা প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা Sub Judice নীতির পরিপন্থী। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের জানা উচিত—বিচারাধীন বিষয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করা যায় না, যা আদালতের চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

দুদকের আপিল: অভিযোগ আছে, দণ্ড নেইঃ
প্রতিবেদনে দুদকের আপিলের বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন আপিল দায়ের হওয়াই অপরাধ প্রমাণের সমান। অথচ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো—চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির আগে কাউকে দোষী বলা যায় না। যদি নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করে থাকে, তবে সেটি একটি চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া মাত্র। আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কাউকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

"অবসরের পর দায়িত্ব পালন: আইনগত প্রশ্নের সমাধান আদালত ও সরকার করবে"

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, তরুণ কান্তি বালা অবসরের পরও দায়িত্ব পালন করছেন। যদি এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি প্রশ্ন থাকে, তার উত্তর দেবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, রেলপথ মন্ত্রণালয় অথবা আদালত। কিন্তু কোনো সরকারি আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ না করে ‘কোন আইনে বহাল আছেন’—এ ধরনের প্রশ্নকে অপরাধের ইঙ্গিত হিসেবে পরিবেশন করা সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতা নয়।

খালাসী নিয়োগ ও সম্পদের অভিযোগ: প্রমাণ কোথায়?
২০১৩ সালের খালাসী নিয়োগে অনিয়ম, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ভারতে সম্পদ থাকা, বেনামে অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলাসহ একাধিক অভিযোগ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনের মধ্যেই স্বীকার করা হয়েছে যে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তাহলে প্রমাণহীন অভিযোগের পাহাড় সাজিয়ে একজন ব্যক্তিকে জনসমক্ষে অভিযুক্ত করার উদ্দেশ্য কী?

সাংবাদিকতার নামে চরিত্রহনন গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়ঃ একজন সরকারি কর্মকর্তা আদালতে আইনি লড়াই করছেন, এবং সেই আদালতই তাকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছেন। এমন অবস্থায় আদালতের আদেশ গোপন রেখে একতরফাভাবে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করা নৈতিক সাংবাদিকতা, তথ্যের ভারসাম্য এবং পেশাগত সততার পরিপন্থী।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কারও সুনাম, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই কাউকে জনসমক্ষে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা গণমাধ্যমের কাজ নয়।

তরুণ কান্তি বালাকে ঘিরে যেসব অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই বর্তমানে বিচারাধীন বা অপ্রমাণিত। অন্যদিকে, হাইকোর্টের আদেশে তার মুক্তিযোদ্ধা গেজেট বাতিলের কার্যকারিতা ১৭ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক তথ্য, যা উপেক্ষা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি একপাক্ষিক, বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।

আমরা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের কাছে দাবি জানাই—আদালতের পূর্ণাঙ্গ আদেশ, আইনি অবস্থান এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির নথিভিত্তিক বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে বিচারাধীন বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।
আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোই প্রকৃত সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত।

logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: মনিরুজ্জামান মনির