ঢাকা ০১ অক্টোবর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ আর বরদাশত করা হবে না : বিপ্লবী পরিষদ বিসিএসে ইতিহাসে প্রথম হয়েও গেজেটে নেই কৃষকের ছেলে সোহেলের নাম যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হামের মারাত্মক ছোবল: নিয়ন্ত্রণে সরকারের ইঁদুর-বিড়াল খেলা! রেলওয়ের চট্টগ্রাম জোনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের ২০২৬-২৭ সালের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন বাড়লো ফার্নেস অয়েলের দাম, কার্যকর রাত থেকেই ‘এআই’-এর নতুন নাম দিলেন ট্রাম্প তুরস্কে ‘নূহের নৌকা’র খোঁজে পাহাড় খনন, গবেষণায় যা মিলল ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৪৮ ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত: বাণিজ্যমন্ত্রী

হামের মারাত্মক ছোবল: নিয়ন্ত্রণে সরকারের ইঁদুর-বিড়াল খেলা!

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ অক্টোবর, ২০২৬,  12:14 PM

news image

দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা জনগণ যখন প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিল, ঠিক তখনই চলতি বছর এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় এক কঠিন সংকট পার করছে বাংলাদেশ। এর নেপথ্যে ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং এর ফলে শিশুদের শরীরে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র ঘাটতি তৈরি হওয়াকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞরা।

নিয়মিত রুটিন টিকার পাশাপাশি প্রতি চার বছর পরপর নির্দিষ্ট একটি বয়সের শিশুদের একযোগে টিকা দেওয়া হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এই ক্যাম্পেইনটি হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও টিকার ঘাটতিসহ নানা কারণে তা পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এটি শুরুর কথা থাকলেও এমআর ক্যাম্পেইনের বদলে নভেম্বরে দেওয়া হয় টাইফয়েডের টিকা।

দীর্ঘ পাঁচ বছর টিকাদান ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার বড় ঘাটতি দেখা দেয়। এর মাশুল হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় মুহূর্তেই ভাইরাসটি দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

২০২০ সালের পর দেশে নিয়মিত এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শিশুদের শরীরে বড় ধরনের প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারের সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও টিকা সংকটের কারণে ক্যাম্পেইন পিছিয়ে দেওয়ায় চলতি বছরে দেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলায় দ্রুত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও যদি দেশব্যাপী হাম ও রুবেলার ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করা যেত, তবে এভাবে সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটত না।

গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২১,২১২ জন / ঢাকা পোস্ট

মার্চের শেষ দিকে প্রাদুর্ভাব তীব্র আকার ধারণ করলে সরকার দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে ৫ এপ্রিল থেকে। ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় এ কার্যক্রম। তবে, ক্যাম্পেইন শুরুর আগে সঠিক মাঠপর্যায়ের পরিকল্পনা (মাইক্রোপ্ল্যান) না করায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, যা গত ২৮ জুন অনুষ্ঠিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের সময় জনসম্মুখে স্পষ্ট হয়।

হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে?

এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম, মুক্তি কবে জানে না কেউ

কমছে না হামের প্রকোপ, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

এর আগে ১৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে টিকার পাশাপাশি পর্যাপ্ত আইসোলেশন নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতিকে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। তবে, এ দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দেশে হামের প্রকোপ বাড়লেও এখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে।’

একই জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান এবং ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রার মাঝে ৪৩ লাখ শিশুর বিশাল ফারাক দেখা গেছে। ইপিআই ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্যে চরম সমন্বয়হীনতা ও মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের অভাবে বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাথমিক টিকার আওতাবহির্ভূত থেকে যায়, যার ফলে টিকার কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠেনি

উপেক্ষিত আইসোলেশন ও অন্যান্য পদক্ষেপ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম আক্রান্ত একজন শিশু থেকে সর্বোচ্চ ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। তাই আক্রান্তদের আইসোলেশন বা পৃথক রাখার ওপর তারা শুরু থেকেই জোর দিয়ে আসছেন। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। এমনকি হাসপাতালগুলোতেও আইসোলেশনের সুব্যবস্থা ছিল না।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০০ শিশু ও তাদের ১০০ জন মায়ের ওপর একটি গবেষণা চালায় ‘এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ (এআরএফ)। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯.৪ শতাংশই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা প্রকাশ করে।

হাম সেরে গেলেও ঝুঁকি শেষ নয়, শিশুদের তাড়া করে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা

‘গরিব বলে কি আমরা চিকিৎসা পাব না?’

টিকা কার্যক্রম চলমান, তবুও কেন বাড়ছে হামে শিশু মৃত্যু?

এ বিষয়ে ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা’-এর সভাপতি ও আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘শুরু থেকেই ব্যাপক জনসচেতনতার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ছয় মাসের নিচে এবং পাঁচ বছরের ওপরের শিশুদের জন্য আমরা টিকার ব্যবস্থা করছি না, অথচ তাদের আক্রান্তের হারও কিন্তু কম নয়। কেবল ভ্যাকসিন দিলেই এটা কমবে না, জনস্বাস্থ্যের অন্য পদক্ষেপগুলোতেও জোর দিতে হবে। যেখানে আমরা কোভিডের সময়ের মতো সাফল্য দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি।’

সংক্রমণ রুখতে আইসোলেশন ও জনস্বাস্থ্যের অন্যান্য পদক্ষেপ সরকারের তরফ থেকে ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি হাসপাতালেই নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে। পাশাপাশি রেফারেল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে একই রোগীর তথ্য বারবার সার্ভারে যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও বিশাল ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘কোনো শিশুর জ্বর হলেই গৃহস্থালি পর্যায় থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা বাস্তবে সম্ভব নয়, তাই আইসোলেশনের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি ৬ মাসের কম এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও আক্রান্তের হার বেশি থাকায় পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বের শিশুদেরও দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালে আসা হামের রোগীদের আলাদা ও সুনির্দিষ্ট স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এটি করতে না পারলে শিশুদের হামের সংক্রমণ থেকে মুক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে চরম অদক্ষতা

হামের প্রকোপ বাড়ায় সরকার ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে এবং ২০ এপ্রিল থেকে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। এতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল।

কিন্তু এর ঠিক দুই মাস পর অনুষ্ঠিত একই বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ২৩ লাখ। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একই জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানে ফারাক দাঁড়ায় ৪৩ লাখ। অথচ দুটি কর্মসূচির মূল তথ্য সরবরাহ করেছিল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান।

ইউনূস সরকারের আমলেও ছিল টিকা, যে কারণে দেওয়া হয়নি

হামে মৃত্যু: ৬৩ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের কম

হামে ৩০ বছরের ছেলেকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন বৃদ্ধ বাবা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। কর্মসূচি শেষে নির্ধারিত সময়ের পরও টিকা দেওয়া অব্যাহত রাখা হয় এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ২০ লাখ বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায় থেকে ভুল তথ্য এলে ইপিআইয়ের করার কিছু থাকে না।

কোনো শিশুর জ্বর হলেই বাড়ি থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। আমরা শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে পারিনি, যা বাস্তবে সম্ভবও নয়। তাই হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। তা না হলে শিশুদের হাম মুক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান, সভাপতি, ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা

ভুলের কথা স্বীকার করে ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যমাত্রার যে গ্যাপ ছিল, তা দূর করতে বাদ পড়া শিশুসহ নতুন করে ৬ মাস পূর্ণ হওয়া ৩৪ লাখ শিশুকে দ্বিতীয় দফায় টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। এটি সফল হলে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ সম্ভব হবে। একই স্থান থেকে তথ্য আসার পরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার বিশাল ব্যবধান থাকায় কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়নি।’

এ বিষয়ে টিকা-বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ভুলের কারণে ক্যাম্পেইনে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। ২০১০ সালের ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০২৬ সালে এসে বয়সসীমা আরও ৩ মাস কমানোর পরও একই লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে ধরা হলো, তা বোধগম্য নয়।’

logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: মনিরুজ্জামান মনির